বাংলা একাডেমীর সাড়ে তিন হাজার প্রকাশনা পাওয়া যায় না
বাংলা একাডেমী এযাবৎ যত বই ও পত্রিকা প্রকাশ করেছে, তার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম মুদ্রণ শেষ। পুনর্মুদ্রণ বন্ধ। এ কারণে বহু প্রয়োজনীয় বই পাঠকেরা চাইলেও হাতে পাচ্ছে না। একাডেমী কর্তৃপক্ষ বলেছে, অর্থাভাবে পুনর্মুদ্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার ধারাকে সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলা একাডেমী যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমী পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একাডেমী ৩১৭টি পত্রিকা ও বই প্রকাশ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে মোট প্রকাশনা ছিল ৪৬৬টি। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত একাডেমী থেকে প্রকাশিত বই ও পত্রিকার সংখ্যা চার হাজার ৭১৩টি।
তবে একাডেমীর বর্তমান বিক্রয়যোগ্য প্রকাশনার তালিকায় রয়েছে মাত্র এক হাজার ৩৪৭টি বই ও ছয়টি পত্রিকা। এই তালিকাভুক্ত বইয়ের মধ্যেও শতাধিক বই বিক্রি হয়ে গেছে বলে পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ তালিকাভুক্ত বইগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান বিশ্বকোষ, নজরুল রচনাবলি, প্লেটোর রিপাবলিক, বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগসহ ৩৪টি বিভাগের শতাধিক বই শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে একাডেমীতে এখন বই সাকল্যে প্রায় এক হাজার ২০০। বাকি সাড়ে তিন হাজারের বেশি বই ও পত্রিকার পুনর্মুদ্রণ বন্ধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিপণন কর্মকর্তা জানান, প্রতিবছরই কিছুসংখ্যক বই শেষ হয়ে যায়। এ বছর বইমেলার আগে পুনর্মুদ্রণের জন্য ৮২টি বইয়ের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে অভিধানসহ চাহিদাসম্পন্ন কয়েকটি মাত্র বই পুনর্মুদ্রণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তা ছাড়া বর্তমান তালিকায় বইয়ের সংখ্যার পাশাপাশি কমেছে বিষয় শিরোনামের সংখ্যাও। ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমী প্রকাশিত শহিদা খাতুন সংকলিত ও সম্পাদিত বাংলা একাডেমী গ্রন্থপঞ্জিতে ৪০টি বিষয় শিরোনামের আওতায় মোট দুই হাজার ৯২১টি বইয়ের উল্লেখ করা হলেও এখন ৩৪টি বিষয় শিরোনামে বই প্রকাশিত হচ্ছে। ‘অফিস-আদালত’, ‘খেলাধুলা’ ও ‘সাধারণ বিজ্ঞান’ শিরোনামগুলো হালফিল তালিকায় উল্লেখ নেই।
চাহিদা থাকলেও পুনর্মুদ্রণ নেই পাঠ্যপুস্তকের: একাডেমী এ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের প্রায় ৪০টি বিভাগের পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেছে। এর অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে পঠিত হয়। এসব জরুরি পাঠ্যপুস্তকের অধিকাংশের পুনর্মুদ্রণ বন্ধ।
আইন বিষয়ের ৫০টি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১৪টি। অর্থনীতির ৬০টি বইয়ের মধ্যে আছে ২৭টি। ইতিহাসের ১৭০টির মধ্যে ৬২টি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ২৭টির মধ্যে আটটি এবং সমাজবিজ্ঞান-সমাজকল্যাণ ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১৩৭টির মধ্যে আছে ১৭টি বই।
জীবনীগ্রন্থ ও রচনাবলি শেষ: জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তিন শতাধিক। এখন আছে মাত্র ১২০টি। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম রোকেয়া, লালন শাহ, মুনীর চৌধুরী, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীনসহ অনেকের জীবনীগ্রন্থই প্রথম প্রকাশের পর আর পুনর্মুদ্রণ হয়নি।
এ ছাড়া ৭০ জন লেখকের দেড় শ খণ্ডের মতো রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে। এখন বিক্রির তালিকায় মাত্র কয়েকজন লেখকের ৬০ খণ্ডের মতো রচনাবলি পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল্লা কায়সার, জহির রায়হান, মুনীর চৌধুরী, আহসান হাবীবসহ অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিকের শ খানেক রচনাবলি সংগ্রহ করতে চাইলেও পাওয়া যাবে না, পুনর্মুদ্রণ না হওয়ায়।
সৃজনশীল সাহিত্য ও অনুবাদ: একাডেমী সৃজনশীল সাহিত্যের প্রকাশনা হাজার খানেক। এগুলো জনপ্রিয়ও। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন শ দুয়েক প্রকাশনা ছাড়া আগের প্রকাশনা পাওয়া যায় না।
একই অবস্থা অনুবাদের ক্ষেত্রেও। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে দর্শন, উপন্যাস, নাটক, কবিতাসহ বিশ্বসাহিত্যের বহু উল্লেখযোগ্য বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে একাডেমী থেকে। এ ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম দফার প্রকাশনা ফুরিয়ে যাওয়ার পর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আর পুনর্মুদ্রণ হচ্ছে না।
লেখকেরা অন্য প্রকাশনা থেকে বই করতে পারেন: এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচারক শামসুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুনর্মুদ্রণের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সরকার সেই পরিমাণ অর্থ আমাদের বরাদ্দ দেয় না। বই বিক্রির টাকা দিয়ে এসব বইয়ের পুনর্মুদ্রণ করা হয়।’ তিনি বলেন, একাডেমী যেসব বই একবার প্রকাশ করে আর পুনর্মুদ্রণ করছে না, লেখকেরা চাইলে অন্য জায়গা থেকে সেসব বইয়ের পুনঃপ্রকাশ করতে পারেন। -প্রথম আলো